কাঁচা দুধ খেলে কি হয় ?

ভূমিকা :


 গ্রামের অনেক মানুষ ছোটবেলা থেকেই কাঁচা দুধ খেয়ে অভ্যস্ত। তাদের ধারণা এতে পুষ্টি বেশি থাকে কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে কাঁচা দুধে ভালো ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি ক্ষতিকর জীবাণুও থাকতে পারে।


 তাই খাওয়ার আগে এর ভালো-মন্দ দুই দিক জানা জরুরি।  
আজকের এই পোস্টে আমরা জানবো কাঁচা দুধ খেলে শরীরে কি হয়। কোন বয়সের মানুষের জন্য এটা ভালো আর কার জন্য ক্ষতিকর।

 পোস্ট সূচিপত্রঃ কাঁচা দুধ খেলে কি হয়


 কাঁচা দুধ খেলে কি হয়


কাঁচা দুধ খেলে শরীরে দ্রুত শক্তি আসে। কারণ এতে থাকা প্রাকৃতিক শর্করা ও ফ্যাট সরাসরি শরীরে শোষিত হয়। যারা শারীরিক পরিশ্রম করে তাদের জন্য এটা দারুণ এনার্জি ড্রিংক।  

আবার কাঁচা দুধে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া আমাদের পেটের হজমশক্তি বাড়ায়। ল্যাকটোজ হজমের সমস্যা থাকলেও অনেকের কাঁচা দুধে সমস্যা হয় না। 
 
তবে মনে রাখতে হবে দুধটা যেন পরিচ্ছন্ন খামার থেকে আসে।নোংরা পরিবেশের দুধ খেলে উল্টো পেটের অসুখ হতে পারে।

কাঁচা দুধের পুষ্টিগুণ ও উপাদান


কাঁচা দুধে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ভিটামিন a,d,e এবং b কমপ্লেক্স। জ্বাল দেওয়ার সময় এই ভিটামিনগুলোর ২০-৩০% নষ্ট হয়ে যায়। এতে প্রাকৃতিক এনজাইম ল্যাকটেজ ও ফসফাটেজ থাকে।

 এই এনজাইমগুলো দুধ হজম করতে এবং ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে।  
এছাড়া কাঁচা দুধে cla এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। যা হার্টের জন্য ভালো এবং শরীরের প্রদাহ কমায়।


কাঁচা দুধ খাওয়ার উপকারিতা


নিয়মিত কাঁচা দুধ খেলে হাড়ের গঠন মজবুত হয়। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন D এর কারণে বাচ্চাদের উচ্চতা বাড়তে এবং বয়স্কদের হাড় ক্ষয় রোধে সাহায্য করে।  কাঁচা দুধের প্রোবায়োটিক অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়।

ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস ও পেটের সমস্যা কমে যায়। ইমিউন সিস্টেমও শক্তিশালী হয়।  
ত্বকের জন্য কাঁচা দুধ অসাধারণ।

 এটা খেলে এবং মুখে লাগালে ত্বক উজ্জ্বল হয়, ব্রণের দাগ দূর হয়। চুল পড়াও কমায়।


কাঁচা দুধ খাওয়ার অপকারিতা ও ঝুঁকি


কাঁচা দুধের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ব্যাকটেরিয়া। Salmonella, Listeria এর মতো জীবাণু থাকতে পারে। এগুলো খেলে বমি, ডায়রিয়া ও জ্বর হতে পারে। 
 
শিশু, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা মানুষের জন্য কাঁচা দুধ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের শরীর এই জীবাণুর সাথে লড়তে পারে না।  তাই সবসময় বিশ্বস্ত খামার থেকে দুধ নিতে হবে।


 সম্ভব হলে হালকা ৭০ ডিগ্রি তাপে ১৫ সেকেন্ড পাস্তুরিত করে নিলে ৯০% জীবাণু মারা যায়।


 সকালে খালি পেটে কাঁচা দুধ খেলে কি হয়


সকালে খালি পেটে ১ গ্লাস কাঁচা দুধ খেলে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়। শরীরে প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম সরাসরি যায় তাই এনার্জি লেভেল ভালো থাকে।  এটি ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। 

যারা রোগা তারা সকালে কাঁচা দুধের সাথে কলা ও খেজুর মিশিয়ে খেতে পারে। এতে দ্রুত ওজন বাড়বে।  
তবে যাদের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা আছে তারা খালি পেটে খাবেন না। 

আগে হালকা বিস্কিট খেয়ে তারপর দুধ খান।


 রাতে কাঁচা দুধ খাওয়ার নিয়ম


রাতে ঘুমানোর ১ ঘন্টা আগে কুসুম গরম কাঁচা দুধ খাওয়া ভালো। এতে থাকা ট্রিপটোফ্যান ঘুম ভালো করতে সাহায্য করে। মানসিক চাপও কমে।
  
যারা জিম করে তারা রাতে কাঁচা দুধ খেলে মাসল রিকভারি ভালো হয়। কারণ রাতে শরীর প্রোটিন শোষণ করে মাসল তৈরি করে।  তবে ডায়াবেটিস রোগীরা রাতে মিষ্টি ছাড়া খাবেন।

 আর ঠান্ডার সমস্যা থাকলে এক চিমটি হলুদ ও গোলমরিচ গুঁড়া মিশিয়ে নিতে পারেন।


কাঁচা দুধ ও  জ্বাল দেওয়া দুধ


কাঁচা দুধে পুষ্টি বেশি থাকে কিন্তু জীবাণুর ঝুঁকি থাকে। আর জ্বাল দেওয়া দুধে জীবাণু মরে যায় কিন্তু কিছু ভিটামিন ও এনজাইম নষ্ট হয়।  স্বাদের দিক থেকে কাঁচা দুধের ক্রিমি ভাব বেশি।

 জ্বাল দিলে দুধের স্বাদ কিছুটা পরিবর্তন হয়। অনেকে কাঁচা দুধের কাঁচা গন্ধ পছন্দ করে না।  
সিদ্ধান্ত হলো: যদি দুধ ১০% পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে আসে তবে কাঁচা খাওয়া যায়।

 নাহলে বাসায় এনে একবার ফুটিয়ে নেওয়াই নিরাপদ।


 শিশুরা কি কাঁচা দুধ খেতে পারবে


১ বছরের কম বয়সী শিশুকে কখনোই কাঁচা দুধ দেওয়া যাবে না। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে তাই জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।  ১ বছরের বেশি বাচ্চাদেরও ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কাঁচা দুধ না দেওয়াই ভালো।



এর বদলে পাস্তুরিত দুধ বা ফর্মুলা দুধ দিন।  বড় বাচ্চাদের দিতে চাইলে অবশ্যই ভালো করে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে দিন। এতে পুষ্টিও থাকবে আবার ঝুঁকিও থাকবে না।


 গর্ভবতী মায়েরা কাঁচা দুধ খেতে পারবে কি


না ভাই, গর্ভবতী অবস্থায় কাঁচা দুধ খাওয়া একদম নিষেধ। Listeria ব্যাকটেরিয়া গর্ভের বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। এমনকি মিসক্যারেজও হতে পারে।  

গর্ভাবস্থায় ক্যালসিয়াম ও প্রোটিনের জন্য পাস্তুরিত দুধ খান। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটও খেতে পারেন।  নিরাপত্তাই প্রথম।
 ৯ মাস কষ্ট করে বাচ্চাকে সুস্থভাবে পৃথিবীতে আনার জন্য এই কয়েক মাস সাবধান থাকা জরুরি।

 কাঁচা দুধ দিয়ে ফেসপ্যাক ও বিউটি টিপস


কাঁচা দুধের ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বকের মরা কোষ দূর করে। ২ চামচ কাঁচা দুধ , ১ চামচ বেসন মিশিয়ে ১৫ মিনিট মুখে লাগিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ত্বক নরম হবে। 
 
চুলের জন্য কাঁচা দুধ , মধু মিশিয়ে স্ক্যাল্পে লাগান। ২০ মিনিট পর শ্যাম্পু করুন। এতে খুশকি কমে এবং চুল সিল্কি হয়।
  
সানট্যান দূর করতে কাঁচা দুধ , টমেটোর রস মিশিয়ে লাগান। সপ্তাহে ৩ দিন করলে ১ মাসে ফল পাবেন।


 কাঁচা দুধ কতক্ষণ ভালো থাকে ও সংরক্ষণ



কাঁচা দুধ ফ্রিজ ছাড়া ২ ঘন্টার বেশি রাখা যাবে না। গরমে ৩০ মিনিটের মধ্যেই নষ্ট হতে শুরু করে। তাই দোহানোর সাথে ফ্রিজে রাখুন।
  
ফ্রিজে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখলে ৩-৪ দিন ভালো থাকে। তবে প্রতিদিন বের করে জ্বাল দিয়ে আবার ঠান্ডা করুন। এতে আয়ু বাড়ে। 
 
দুধ নষ্ট হয়েছে কিনা বুঝার উপায় হলো গন্ধ। টক গন্ধ বা দলা পাকলে ফেলে দিন। কখনো বাসি দুধ খাবেন না।

 কাঁচা দুধ খাওয়া কি উচিত


কাঁচা দুধ পুষ্টির পাওয়ার হাউস। কিন্তু এর সাথে জীবাণুর ঝুঁকিও আছে। তাই সিদ্ধান্ত আপনার।
 
আপনি ঝুঁকি নিতে পারবেন কিনা।  আমার পরামর্শ হলো: সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা বিশ্বস্ত উৎস থেকে অল্প পরিমাণে খেতে পারে। কিন্তু শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য জ্বাল দেওয়াই ভালো।
  
সবশেষে বলব, যাই খান পরিমিত খান। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। সুস্থ থাকুন। 

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url