চাঁপা ফুল কখন ফুটে।
সাধারণত গ্রীস্মের শুরু থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত এবং কোন কোন জাতের ফুলের ক্ষেত্রে শরৎকাল পর্যন্ত চাঁপা ফুল ফোটে। চাঁপা ফুলের বিভিন্ন জাত রয়েছে এসব জাতের উপর ভিত্তি করে চাঁপা ফুল ফোটার কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
চাঁপা ফুল কখন ফোটে এবং কোন কোন মাসে ফোটে এ সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত জানানো হলো। আজকের পোস্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানবো।
পেজ সূচিপত্র :চাঁপা ফুল কখন ফুটে।
- চাঁপা ফুলে পরিচয়।
- ফুল ফোটার মৌসুম।
- দিনের কোন সময় ফুল ফোটে।
- স্বর্ণ চাঁপা কখন ফোটে।
- শ্বেত চাঁপা কখন ফোটে।
- নাগচাঁপা কখন ফোটে।
- ফুল ফোটার জন্য আবহাওয়া।
- মাটি ও রোদের প্রয়োজন।
- কেন ফুল ফোটে না।
- বেশি ফুল ফোটানোর উপায়।
- ঘ্রাণ ও বৈশিষ্ট্য
- শেষ কথা : চাঁপা ফুলের ব্যবহার।
চাঁপা ফুলে পরিচয়।
চাঁপা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Magnolia champace.এটি ম্যাগনেলিয়া পরিবারের একটি ফুল।চাঁপা ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। যেমন :বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, বেশি জন্মায়।চাঁপা ফুল সাধারণত দুটি রংয়ের হয়ে থাকে হলুদ ও সাদা।
চাঁপা ফুল গাছ ১০ থেকে ১৫ মিটার লম্বা হয়। পাতাগুলো সবুজ রঙের হয়। চাঁপা ফুল দুই রকমের হয় সাদা ও হলুদ বিভিন্ন গাছে বিভিন্ন ফুল ফোটে। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা কলির মতো। চাঁপা ফুল ফুটার পর 15 থেকে 20 টি পাপড়ি খুলে পরে। ফুল থেকে অনেক সুন্দর ঘ্রাণ বের হয়।
চাপা ফুলকে হিন্দু ধর্মের পবিত্র মনে করা হয়। তারা এই ফুল ব্যবহার করে পুজো করে কিন্তু বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এই ফুলকে ভালোবাসে। বিয়ের মালা তৈরিতেও তুই ফুল ব্যবহার করা হয়। পারফিউম তৈরিতেও এই ফুল ব্যবহার করা হয় এইজন্য এর চাহিদা বাণিজ্যিকভাবে অনেক।
ফুল ফোটার মৌসুম।
চাঁপা ফুল ফোটার মৌসম হ্যালো এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত। বাংলা মাসের থেকে আশি মাস পর্যন্ত ফুল ফোটে। এরমধ্যে জুন জুলাই মাসে ও সবচেয়ে বেশি ফুল ফুটে থাকে। এই ৬ মাস ফুলে গাছ ভরে থাকে এবং বর্ষাকাল হলো এর জনপ্রিয় সিজন।
গরমকালে গাছের নতুন নতুন কুসি আসতে শুরু করে। যখন বৃষ্টির পানি পাই তখন গাছের কুশি গুলো বড় হতে থাকে। যখন একটানা বৃষ্টি হয় তখন ফুলের সংখ্যা বেড়ে যায়। শীতকালে গাছ ঘুমিয়ে থাকে এজন্য ফুল ফোটে না আবার শীতের শেষে ফুল ফুটতে থাকে।
তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রি হলে ফুল ভালো ফোটে।অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে ফুলের কুসি ঝরে যায়। আবার অতিরিক্ত গরমে ফুল দ্রুত শুকিয়ে যায়। তাই চাঁপা ফুলের জন্য বর্ষার মৌসুম বা আবহাওয়া এর জন্য সেরা। এই সময় গাছে প্রতিদিন নতুন ফুল ফোটে।
দিনের কোন সময় ফুল ফোটে।
চাঁপা ফুল সাধারণত ভোর ৪টা থেকে ভোর ৬ টার মধ্যে ফুটে। সূর্য উঠার আগেই এর পাপড়ি খুলতে শুরু করে এবং সকাল ৮ টার মধ্যে ফুল পুরোপুরি ফুটে যায়। সেই সময় ফুল তাজা ও সতেজ থাকে। ফুলের গন্ধ ও ভালো পাওয়া যায় । এজন্য সকালে ফুল সংগ্রহ করা দরকার।
আবার দুপুরের রোদে ফুলের গন্ধ কিছুটা কমে যায়। বিকেলে আবার চাঁপা ফুল নেতিয়ে পরে। সন্ধ্যার পর থেকে এই গন্ধ আবার বেড়ে যায়। এজন্য রাতে গাছের পাশে গেলে মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায়।
ফুল ফোটার ২৪ ঘন্টার মধ্যে ফুল ঝরে যায়। একটি ফুল গাছে এক দিনের বেশি থাকে না এবং ঝরে যাওয়ার আগে এর রং বাদামী রঙের হয়ে যায়। তাই প্রতিদিন নতুন ফুল ফোটে। ফুলের সিজনে গাছ কখনো ফুল ছাড়া থাকে না।
স্বর্ণ চাঁপা কখন ফোটে।
স্বর্ণচাঁপা হলো চাঁপা ফুলের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলুদ চাঁপা। এই ফুলটি এপ্রিল মাস থেকে ফুটতে শুরু করে এবং জুলাই পর্যন্ত প্রচুর ফুল দেয়। স্বর্ণচাঁপা ফুলের রং গারো হলুদ ও সোনালী হয়। স্বর্ণচাঁপা ফুলের গন্ধ অন্য চাঁপা ফুলের চেয়ে বেশি কড়া।
স্বর্ণচাঁপা গাছে ফুল আসতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। প্রথম বছর ফুল কম আসে কিন্তু গাছ যত পুরনো হয় ফুল তত বেশি ফোটে। ধারণা করা যায় বড় গাছে একসাথে ১০০ টাও ফুল ফোটে। এর কুড়ি দেখতে অনেকটা কাঁঠালের মতো।
স্বর্ণ চাঁপা ফুল রোদ পছন্দ করে। দিনে ৬ ঘণ্টা রোদ পেলে এই ফুল বেশি ফোটে। আবার ছায়ায় রাখলে ফুল কম ফুটে। বৃষ্টির পানি পেলে এর রং আরো উজ্জ্বল হয়। তাই চাঁপা ফুল খোলা জায়গায় লাগানো ভালো।
শ্বেত চাঁপা কখন ফোটে।
শ্বেত চাঁপা সাধারণত সাদা রঙের হয়। এই ফুলের সিজন মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত থাকে। স্বর্ণচাঁপা ফুলের চেয়ে একটু দেরিতে ফোটে । আবার এই ফুলের গন্ধ হালকা মিষ্টি।
সাদা চাঁপার পাপড়ি হলুদ চাঁপা ফুলের চেয়ে বড় হয়।এই ফুলের আকার পাঁচ থেকে সাত সেন্টিমিটার হয়।শ্বেত চাঁপা ভোরে ফোটার পর সারাদিন সতেজ থাকে। সন্ধ্যায় এর রং হালকা হলুদ হয়ে যায়। তারপর পরের দিন সকালে ফুলটি ঝরে পড়ে যায়।
হিন্দু ধর্মে এ ফুলকে পবিত্র মনে করা হয় এবং এই ফুল পূজায় বেশি ব্যবহার করা হয়। সাদা হওয়ায় ফুল দেখতেও পবিত্র লাগে। শ্বেত চাঁপা ফুলের গাছ কিছুটা ঝোপালো হয়।নিয়মিত পানি দিলে ফুল বেশি পাওয়া যায়। এই ফুল টবেও লাগানো যায় ।
নাগচাঁপা কখন ফোটে।
নাগচাঁপা আসলে কাঠগোলাপ গোত্রের ফুল। অনেকে একে চাঁপা ভেবে ভুল করে ফেলে। নাগচাঁপা প্রায় সারা বছরই ফোটে।তবে মার্চ থেকে অক্টোবর বেশি ফোটে। গরম কালে গাছ ভরে ফুল আসে।
এই ফুলের রং সাদা এবং মাঝে মাঝে হলুদ এবং পাঁচটি পাপড়ি হয়। এই ফুলের গন্ধ খুব হালকা। এই গাছে পাতা না থাকলেও ফুল ফোটে। অন্য গাছের চেয়ে এই ফুলের গাছ একটু আলাদা। তাই শীতেও মাঝে মাঝে ফুল দেখা দেই।
নাগচাঁপা গাছে কোন যত্ন লাগে না। এর ডাল কেটে লাগালেই গাছ হয়ে যায়। আবার রোদে রাখলে বেশি ফুল দেই। পানি কম দিলেও সমস্যা হয় না। নতুন যারা বাগান তৈরি করতেছে তাদের জন্য এটি সেরা গাছ।
ফুল ফোটার জন্য আবহাওয়া।
চাঁপা ফুলের জন্য আর্দ্র আবহাওয়া খুবই দরকার। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি থাকলে গাছের কুড়ি ভালো থাকে। শুকনো আবহাওয়ায় গাছের কুঁড়ি ঝরে যায়, এদিকে খেয়াল রাখা উচিত। বর্ষার ভেজা আবহাওয়া এর জন্য আদর্শ তাই বাংলাদেশের ফুল ভালো হয়।
কিন্তু অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি পেলে ফুল পচে যেতে পারে। পানির দিকে খেয়াল রাখা উচিত। গাছের গোড়ায় পানি জমতে দেওয়া যাবে না। ঝরে বা জোরে বাতাসে গাছের কুঁড়ি ভেঙ্গে যেতে পারে। হালকা বাতাস ফুলের জন্য ভালো।
চাঁপা ফুলের জন্য তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির আসে পাশে থাকলে ভালো হয়। ৩৫ ডিগ্রি উপরে গেলে ফুল ছোট হয়ে যায়। আবার ২০ ডিগ্রির নিচে গেলে ফুল আসা বন্ধ হয়ে যায়।তাই শীতে ফুল ফোটে না। বসন্ত থেকে তাপমাত্রা বাড়লেই আবার গাছে ফুল আসতে শুরু করে ।
মাটি ও রোদের প্রয়োজন।
চাঁপা ফুলের জন্য দোআঁশ মাটি ভালো। মাটিতে জৈব সার বেশি থাকতে হবে। মাটির পিএইচ ৬ থেকে ৬.৫ হলে ফুল ভালো ফুটে। আবার এঁটেল মাটিতে ফুল কম হয় এবং বেঁলে মাটিতেও পানি ধরে রাখতে পারে না তাই ফুল ঝরে যায়।
চাঁপা ফুলের জন্য দিনে কমপক্ষে পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার রোদ দরকার। সকালের রোদ খুব উপকারী এজন্য সকালে ফুল রোদে রাখা উচিত। আবার দুপুরের রোদে তাপ বেশি থাকায় গাছের পাতা পুড়ে যেতে পারে। তখন গাছ বারান্দায় রাখলে ভালো হয়।
টবে গাছ লাগানোর সময় ১৪ ইঞ্চি টব ব্যবহার করুন।প্রতি তিন মাস পর পর সার দিতে হবে । গোবর ও সার খুব ভালো কাজ করে । মাটি শুকানোর পর পানি দিতে হবে। বেশি পানি দিলে শিকড় পচে যেতে পারে।এজন্য পরিমাণ মতো পানি দেওয়া উচিত।
কেন ফুল ফোটে না।
গাছের বয়স দুই বছরের কম হলে ফুল কম আসে অথবা অনেক সময় ফুলই আসে না। অনেকেই নতুন গাছে ফুল না আসায় চিন্তায় পড়ে যান। ফুল আসার জন্য গাছকে সময় দিতে হবে। গাছের যত্ন নিতে হবে। গাছ পরিপক্ক হলেই ফুল আসবে এজন্য একটু ধৈর্য ধরুন।
গাছের নাইট্রোজেন সার বেশি দিলে শুধু পাতা হয় ফুল আসে না। আবার ফসফরাস ও পটাশ সার ফুল ফোটাতে সাহায্য করে। তাই সর নির্বাচন করার সময় সতর্ক থাকুন। শুধু ইউরিয়া প্রয়োগ করবেন না।
আবার গাছ যদি ছায়ায় থাকে তাহলে ফুল ফোটে না। রোদের অভাবে কুড়ি ঝরে যায়। গাছের ডালপালা বেশি ঘন হলেও ফুল কম আসে। তাই বছরে একবার ডাল ছটায় করুন। আলো বাতাস পর্যাপ্ত পরিমাণ পেলে ফুল বাড়বে।
বেশি ফুল ফোটানোর উপায়।
শীতের শেষে গাছের ডাল ২০% কেটে দিন তাহলে গাছে নতুন ডাল আসবে। কারণ নতুন ডালের বেশি ফুল ফোটে। কাটা জায়গায় ফাঙ্গিসাইড লাগিয়ে দিন । এতে করে গাছ সুস্থ থাকবে। নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করা দরকার।
ফেব্রুয়ারি মাসে একবার গাছে জৈব সার প্রয়োগ করুন।৫০ গ্রাম হাড়ের গুড়ো ও ১০০ গ্রাম গোবর সার প্রয়োগ করুন। তারপর মাটির সাথে মিশিয়ে পানি দিন। তারপর মার্চ ফুল আসা শুরু হবে। এপ্রিল মাসে গাছ ফুলে ভরে যাবে।
প্রতিদিন সকালে গাছে পানি স্প্রে করুন। এতে গাছের কুঁড়ি ঝড়ে পড়বে না। মাসে একবার সরিষার খৈল পচা পানি দিন। এতে ফুলের সংখ্যা দ্বিগুণ হবে। সঠিকভাবে নিয়মিত যত্ন নিলে ২০০ প্লাস ফুল পাওয়া সম্ভব।
ঘ্রাণ ও বৈশিষ্ট্য
চাঁপা ফুলের ঘ্রাণ মিষ্টি ও তীব্র। এই ফুলের গন্ধ ১০০ মিটার দূর থেকেও পাওয়া যায়। এই ঘ্রাণে মানুষের মন ভালো হয়ে যায় এবং মানসিক চাপ কমতে সাহায্য করে। এজন্য প্রত্যেক মানুষের ঘরে ঘরে চাঁপা ফুল লাগানোর দরকার।
এই ফুলের ঘ্রান সন্ধ্যায় সবচেয়ে বেশি ছড়াই। কারণ এই সময় পরাগায়নকারী পোকা আসে। মৌমাছি ও প্রজাপতি এই ফুল খুব পছন্দ করে। ঘ্রানের উৎস হলো এসেনশিয়াল অয়েল। এই তেল থেকে দামি পারফিউম তৈরি করা হয়।
চাঁপা ফুলের পাপড়ি নরম ও মোমের মত হয়। হাতে নিলে সহজে নষ্ট হয়ে যায়। তাই ফুল ছেরার সময় সাবধানে ছিড়তে হবে। বোটা সহ ছিড়লে বেশি সময় সতেজ থাকে। ফ্রিজে রাখলে দুইদিন ভালো থাকে। ফুল ছেড়ার সময় সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার।
শেষ কথা : চাঁপা ফুলের ব্যবহার।
হিন্দুদের পূজা ও বিয়েতে চাঁপা ফুলের অনেক চাহিদা রয়েছে। মালা ও খোঁপায় পড়ার জন্য এই ফুল ব্যবহার করা হয়। মেয়েরা তাদের চুলে চাঁপা ফুল গুঁজতে পছন্দ করে।এই ফুলের গন্ধ মনকে পুলকিত করে।এই ফুল দিয়ে গাজরা তৈরি করা হয়।
চাঁপা ফুল থেকে তেল ও তৈরি করা হয়। এই তেল চুলের জন্য খুব ভালো এবং ত্বকের জন্য উপকারী। আয়ুর্বেদিক ঔষধেও চাঁপা ফুল ব্যবহার করা হয়। জ্বর ও বাতের ব্যথায় এর অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে।
চাঁপা গাছ কাঠ হিসেবেও অনেক দামি। এর কাঠ দিয়ে আসবাপত্র তৈরি করা হয়। চাঁপা গাছটি পরিবেশের জন্য অনেক ভালো। এজন্য চাঁপা ফুলের যত্ন নেওয়া দরকার। চাঁপা ফুল যেমন মানুষের কাজে আসে তেমনি চাঁপা গাছও কাঠ হিসেবে কাজে আসে।

.jpg)

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url